মারাত্মক যৌনরোগ গনোরিয়া সম্পর্কে বিস্তারিত

0
607

গনোরিয়া মারাত্মক যৌনরোগ গনোরিয়া আমাদের দেশের অশিক্ষিত ও দরিদ্র সমাজে প্রমেহ নামে পরিচিত। এটি একটি জীবাণুবাহিত রোগ। বিশ্বজুড়ে এ রোগটির বিস্তৃতি যৌনরোগের মধ্য দিয়ে। রোগটির জীবাণু ডিম্বাকৃতি বা শিমের বিচির মতো। থাকে জোড়ায় জোড়ায়।
সুপ্তিকাল : রোগাক্রান্ত সঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে দৈহিক মিলনের পর ৩ থেকে ১০ দিনের মধ্যে এ রোগের প্রকাশ ঘটে। সাধারণত পুরুষের ক্ষেত্রে মূত্রপথের সামনের অংশে জীবাণু সংক্রমণ শুরু করে। উপযুক্ত চিকিৎসা না হলে তা প্রস্টেট গ্রন্থি, এমনকি মূত্রথলি ও শুক্রাশয় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়তে পারে।
উপসর্গ (পুরুষ) : পুরুষের যৌনাঙ্গ, বিশেষ করে প্রস্টেট গ্রন্থি, শুক্রনালি, এপিডাইডাইমিস আক্রমণ করে। আক্রমণের ২-১ দিন পর পর্যাপ্ত ঘন সাদা বা সামান্য হলদে রঙের পুঁজ পড়তে শুরু করে। প্রস্রাবের সময় তীব্র জ্বালা অনুভূত হয়। পুরুষাঙ্গের মাথায় পুঁজ জাতীয় পদার্থ লেগে থাকতে দেখা যায়। এ রোগে পুরুষাঙ্গের গায়ে কোনো ঘা বা ক্ষত দেখা যায় না। হাত দিয়ে ধরলে হালকা ব্যথা অনুভূত হয়। কিছুদিন পর রোগের উপসর্গ কমে যায়। এর মানে রোগটি ভালো হওয়া নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি রূপ লাভ করে বলে ধরে নিতে হবে।
উপসর্গ (নারী) : আক্রান্ত হওয়ার পর যোনিপথের গ্রন্থি, বিশেষ করে জরায়ুমুখের গ্রন্থিতে জীবাণু আক্রমণ করে থাকে। পরে ডিম্বনালি আক্রমণ করে। যোনিপথের ঠিক সামনেই রয়েছে মূত্রপথ। সেখানেও আক্রমণ করে। ফলে যোনিপথ ও মূত্রপথ উভয়ই আক্রান্ত হয়। অল্প বা বেশি পরিমাণে পুঁজ বের হতে দেখা যায়। প্রস্রাবের সময় তীব্র ব্যথা, জ্বালাপোড়া করে, পুঁজ নিঃসরণ হতে দেখা যায়। আবার ডিম্বনালি দিয়ে জীবাণু দেহের গভীরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে সামান্য জ্বর, ম্যাজম্যাজ ভাব দেখা দিতে পারে। তবে অনেক ক্ষেত্রে নারীরা উপসর্গ ছাড়াই থাকতে পারে।জটিলতা (পুরুষের ক্ষেত্রে) : শুক্রনালি বন্ধ হয়ে যেতে পারে। উপ-শুক্রাশয় (এপিডাইডাইমিস) নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ফলে যৌনরসে বীর্যকোষ থাকে না। এ কারণে ব্যক্তিটি সন্তানের পিতা হতে পারেন না। রোগ দীর্ঘস্থায়ী হওয়ায় যিনি তার সঙ্গে দৈহিক মেলামেশা করবেন, তিনিও এ রোগে আক্রান্ত হবেন। রোগটি দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় প্রস্টেট গ্রন্থির প্রদাহ হতে পারে। ফলে প্রস্রাব আটকে বা বন্ধ হয়ে যেতে পারে।
জটিলতা (নারীর ক্ষেত্রে) : দীর্ঘদিন আক্রান্ত থাকলে ডিম্বনালির ছিদ্রপথ বন্ধ হয়ে সন্তানধারণের ক্ষমতা হারাতে পারে। প্রস্রাবের জ্বালাপোড়া, ব্যথা ছাড়াও মূত্রাশয়ের প্রদাহ হতে পারে। আক্রান্ত নারী সন্তান প্রসব করলে সন্তানের চোখ এ জীবাণুর মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে। নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রে হাঁটু বা গোড়ালিতে পুঁজ জমে গিঁরা ফুলে যেতে পারে। দেখা দিতে পারে বাতব্যথার মতো উপসর্গ।
রোগ নির্ণয় : রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস শোনার পর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। যদি স্বল্পস্থায়ী আক্রমণ হয়ে থাকে, তাহলে পুরুষের ক্ষেত্রে প্রস্রাবের রাস্তা থেকে নিঃসরিত পুঁজ বা পদার্থ এবং নারীর ক্ষেত্রে মূত্রনালি ও জরায়ু নিঃসরিত পদার্থ পরীক্ষা করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি হলে প্রস্টেট গ্রন্থি মাসাজের পর নিঃসরিত পদার্থ পরীক্ষা করতে হবে কিংবা সকালের প্রথম ফোঁটা প্রস্রাব পরীক্ষা করা যেতে পারে। জরায়ু নিঃসরিত বস্তুও পরীক্ষা করতে হবে। এছাড়া কালচার ও সেনসিটিভিটি পরীক্ষা করা যেতে পারে।
চিকিৎসা : উভয়েরই চিকিৎসা করাতে হবে। ইনজেকশন এবং খাওয়ার ওষুধের মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। এজন্য একজন যৌনরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে হবে।
পরামর্শ : ২ সপ্তাহ পর আবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে হবে। ৪ সপ্তাহ পর পুনরায় পরীক্ষা করে আরোগ্যের ব্যাপারে নিশ্চিত হতে হবে। প্রতিকারের উপায় হলো জনসাধারণকে যৌনরোগের কুফল সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। এছাড়া প্রয়োজন উপযুক্ত যৌনশিক্ষা গ্রহণ। পতিতালয় বা বহু নারী গমনে নিরুৎসাহিত করতে হবে। রোগের লক্ষণ বুঝেই চিকিৎসা করাতে হবে। আক্রান্ত অবস্থায় উভয়ের সহবাসে বিরত থাকতে হবে। সর্বোপরি এ রোগ থেকে রক্ষা পেতে হলে বৈবাহিক যৌনজীবনই উত্তম পন্থা -এটা উপলব্ধি করতে হবে।

ডা. দিদারুল আহসান চর্ম, যৌন ও অ্যালার্জি রোগ বিশেষজ্ঞ।