মানব স্তনের রহস্য!

0
451

পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে, এদের মধ্যে স্ত্রী প্রাণীদের জন্য স্তন অন্যতম একটি স্বাভাবিক শারীরিক অঙ্গ। আর এই প্রাণীজগতে প্রাণীভেদে স্তনের ধরণ কিংবা আকারও হয় ভিন্ন ভিন্ন। তবে প্রাণীজগতের মধ্যে মানুষের স্তন অন্য সব প্রাণীদের চেয়ে আলাদা। স্তন হল স্তন্যপায়ী প্রাণীদের শরীরে দুগ্ধ (স্তন্য) উৎপাদনকারী গ্রন্থি। স্ত্রী এবং পুরুষ উভয়লিঙ্গেই স্তন থাকলেও একমাত্র স্ত্রী প্রাণীই দুগ্ধ উৎপাদনে সক্ষম। পৃথিবীতে এখন ৫ হাজারের বেশি স্তন্যপায়ী প্রজাতির প্রাণী আছে। এর মধ্যে শুধু হোমো স্যাপিয়েন্সেরই (মানুষ) স্থায়ী বড় আকারের স্তন আছে। তাই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কেন মানুষের স্তন এমন বড়? এটি বিবর্তনের কোনো ভুল কিনা?

স্তন্যপায়ী প্রজাতির অন্যান্য প্রাণীর শুধু গর্ভাবস্থায় অস্থায়ী স্তন থাকে। তাদের স্তনের মূল উদ্দেশ্য দুধ উৎপাদন করা। তাই গর্ভাবস্থা বা শিশুর দুগ্ধপানের সময় চলে গেলে স্তনও প্রায় অদৃশ্য হয়ে যায়।

কিন্তু মনুষ্য প্রজাতির নারীদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম আলাদা। নারীদের স্তন আকার লাভ করে মূলত বয়ঃসন্ধির সময়ে, গর্ভাবস্থায় নয়। তার মানে, আমাদের বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় স্তন সম্পর্কিত কোনো কিছুতে পরিবর্তন এসেছে।

১৯৮৭ সালে জীববিজ্ঞানী টিম ক্যারো উদাহরণ হিসেবে এ সম্পর্কিত ৭টি তত্বের কথা উল্লেখ করেন। এর মধ্যে একটি ছিল, শিশুকে কোলে রাখতে স্তন মায়েদের জন্য উপকারী। একই সঙ্গে স্তন মায়েদেরকে কয়েকটি কাজ করতেও সাহায্য করে। কিন্তু তারপরও এ নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়, শিশু দুধ পান করা ছেড়ে দিলেও কেন স্তন আকারে বড়ই থেকে যায়?

চার্লস ডারউইন- প্রথমে এ প্রশ্নের সবচেয়ে ভালো ব্যাখ্যা দিয়েছেন। খবর টেক ইনসাইডার।

পরবর্তীতে বিখ্যাত প্রাণীবিজ্ঞানী ড্যাসমন্ড মরিসের ১৯৬৭ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ন্যাকেড এইপ’ বইতেও এ সম্পর্কে একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। এই বইতে মরিস স্তনকে যৌন প্রতীক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। মরিস তার বইয়ে লিখেছেন, ডিম্ব স্ফোটনের সময় নারীর পশ্চাদ্দেশের যৌন প্রতীককে প্রতিস্থাপন করেছে স্তন। স্তন দেখেই প্রাচীন যুগের মানুষেরা নারীদের যৌন পরিপক্কতার ব্যাপারে ধারণা পেতেন। যেমন, একজন মানুষ যখন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করেন, তখন তার অন্যান্য যৌনাঙ্গ চোখে পড়ে না। তাই পুরুষরা বুঝতে পারতেন না যে সংশ্লিষ্ট নারীটি যৌন পরিপক্ক কিনা। স্তন এ সমস্যার সমাধান এনে দিয়েছে। নারীদের বয়ঃসন্ধির সময়ে স্তনের আকার লাভের একটি কারণ মোটামুটি এখান থেকে পাওয়া যায়। কিন্তু তাহলে মেনোপোজের পরও কেন নারীর স্তনের আকার একই থাকে?

নারী স্তনের গঠন। স্তন্যপায়ী প্রজাতির অন্যান্য স্ত্রী প্রাণীদের চেয়ে নারীদের স্তনে বেশি চর্বি থাকে। এ চর্বিই স্তনকে একটি স্থায়ী ও নির্দিষ্ট আকার পেতে সাহায্য করে। নারীর স্তন এত বড় আকার ধারণ করতে পারে যে এটা অনেক সময় পিঠে ব্যাথার কারণ পর্যন্ত হতে পারে। এজন্য অনেক নারী স্তনের আকার কমিয়ে আনতে অস্ত্রোপচারও করেন।

২০১৬ সালে শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় ৬১ হাজার নারী তাদের স্তনের আকার ছোট করতে অস্ত্রোপচার করিয়েছেন।

অনেক নারীদের জন্য বড় স্তন অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এছাড়াও এটি অনেকের মৃত্যুরও কারণ হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ধরনের ক্যানসার যেসব নারী মারা যায়, তার মধ্যে সবেচেয় বেশি নারী মারা যায় স্তন ক্যানসারে। প্রতি বছর অন্তত ১৫ লাখ নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। তথ্যসূত্র মতে, ২০১৫ সালে ৫ লাখ ৭০ হাজার নারী স্তন ক্যানসারে মারা যায়।

এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা বলছেন, প্রাণীজগতে অন্যান্য স্ত্রী প্রাণীদের ক্ষেত্রে স্তন ক্যানসার খুবই নগণ্য ও অস্বাভাবিক ঘটনা। এর একটি কারণ হতে পারে, ক্যানসার সময়ের সাথে সাথে বাড়ে এবং অন্যান্য প্রজাতির প্রাণীরা মানুষের মতো এত দীর্ঘসময় বাঁচে না বলে তাদের শরীরেও ক্যানসার সেভাবে দানা বাঁধতে পারে না।

এছাড়াও স্তন ক্যানসারের জন্য স্তনের স্থায়ী টিস্যুও কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেসের ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাসিস্ট্যান্ট ক্লিনিক্যাল প্রফেসর ডা. রেনা কালেহান বলেন, ‘বিভাজিত টিস্যুর মাধ্যমে ক্যানসার হওয়ার ঝুঁকি বেশি। কোষ প্রতিনয়ত মারা যায় এবং নতুন কোষের জন্ম হয়। এটি একটি প্রক্রিয়া। কোষের এ প্রক্রিয়ার মধ্যে ডিএনএর পুনর্গঠনে অনেক সময় ভুল হয়ে যায়। এ ধরনের একটি ভুল কোষের কারণেই ক্যানসারের জন্ম হতে পারে। স্তনের টিস্যু খুব দ্রুত বিভাজিত হয়। তাই এখানে ক্যানসারের ঝুঁকিও বেশি।’

এ ব্যাপারে ডাক্তাররা বলছেন, নারীদের দুটি স্তনই ফেলে দিলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি ৯৫ শতাংশ কমে যায়।

তবে নারীর স্তন কিন্তু সমাজ ও সংস্কৃতিতে স্থান করে নিয়েছে। স্তন নারীদের আকর্ষণীয় করে তুলেছে। স্তনের কারণে বক্ষবন্ধনী বিক্রি ও প্রাপ্তবয়স্কদের ম্যাগাজিনের আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছে।