বিশ্বসেরা হার্ট স্পেশালিস্ট

0
171

বিশ্বব্যাপী হৃদরোগ ধারণ করেছে মহামারী আকার। এ রোগে ঘটছে অকাল মৃত্যুর মতো ঘটনা।  দৈনন্দিন জীবনযাপন, খাদ্যাভ্যাস ও মানসিক বিপর্যস্ত অবস্থা এর জন্য দায়ী জেনেও আমরা বেশির ভাগ মানুষই এই রোগ থেকে নিজেদের এড়াতে পারিনি। ফলে ভুগতে হচ্ছে জটিল এ রোগে, হারাতে হচ্ছে অনেক প্রাণ। মানবদেহে দ্রুত আঘাতকারী এ রোগ থেকে রোগীদের রক্ষা করতে বিশ্বের অনেক ডাক্তারই রপ্ত করে নিয়েছেন প্রয়োজনীয় কলাকৌশল। লিখেছেন নির্দেশনামূলক অনেক বই। হৃদরোগের চিকিৎসা দিয়ে বিশ্বের লাখো মানুষের মন জয় করেছেন। স্বীকৃতিও মিলেছে আন্তর্জাতিকভাবে। আজকের আয়োজনে থাকছে বিশ্বসেরা সে সব হার্ট স্পেশালিস্ট সম্পর্কে বিস্তারিত।

 

 

৬০টির বেশি দেশে ব্যবহার চলে ডা. ইউসুফের বিদ্যা

আন্তর্জাতিকভাবে সুপরিচিত কার্ডিওলজিস্ট ডা. সেলিম ইউসুফ। ভারতে জন্ম নেওয়া কানাডিয়ান বংশোদ্ভূত এ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞকে বিশ্বের এক নম্বর হিসেবে ধরা হয়। বর্তমানে তিনি বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট পদে আছেন। ৩৫ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি কার্ডিওভাসকুলার রোগ প্রতিরোধ ও এর  সু-চিকিৎসায় অত্যন্ত উপযোগী নানা পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। তার আবিষ্কৃত বিদ্যা হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদের সেবায় ৬০টির বেশি দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে। কার্ডিওভাসকুলার এবং সেরিব্রোভসকুলার রোগের সমস্যা সমাধানে ডা. সেলিম সিদ্ধহস্ত। হৃদরোগের সবচেয়ে জটিল ও মারাত্মক পরিস্থিতি প্রতিরোধ ও চিকিৎসার জন্য এসব দেশ ডা. সেলিমের আবিষ্কৃত বিদ্যার ওপর নির্ভর করে। জটিল এ রোগকে সবচেয়ে ভিন্নভাবে দেখা হয়। তাই কার্ডিওভাসকুলার রোগের মহামারী মোকাবিলায় বিশ্ব হার্ট ফেডারেশনকে তিনি যুগোপযোগী করে এগিয়ে নিচ্ছেন।

 

 

বিশ্বখ্যাত কোহ সিয়াম সুন ফিলিপ

সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের ৩০০৮ নম্বর ইন্টেনসিভ কেয়ার ইউনিটে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরকে। তাকে ডা. কোহ সিয়াম সুন ফিলিপের তত্ত্বাবধানে ভর্তি করা হয়। হৃদরোগে কার্যকরী চিকিৎসা প্রদানে ডা. কোহ সিয়াম সোন ফিলিপের সুনাম বিশ্বজোড়া। একজন বিশ্বখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে তার পরিচিতি রয়েছে সবার কাছে। মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালের চিকিৎসকদের প্রোফাইলে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৮৯ সালে এমবিবিএস পাস করেন। পরে একই প্রতিষ্ঠান থেকে ২০০০ সালে এম. মেড (ইন্টারনাল মেডিসিন) ডিগ্রি অর্জন করেন। এ ছাড়াও কার্ডিওলজিতে এফএএমএস করেন এ চিকিৎসক। তিনি ইংরেজির পাশাপাশি ক্যান্টোনিজ, মালয়, ইন্দোনেশিয়ান, মান্দারিয়ানসহ বিভিন্ন ভাষাতেও পারদর্শী।

 

লাখো গরিবের ডাক্তার দেবী শেঠী

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিইউতে ভর্তি হন। তার চিকিৎসায় উপমহাদেশের প্রখ্যাত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. দেবী শেঠীকে আনা হয়। আমাদের দেশের অনেকেই তাকে আগে থেকে চিনলেও এই সুবাদে দেবী শেঠী নামটি আবারও ব্যাপকভাবে পরিচিতি পেয়েছে। কিন্তু নিজের কর্মময় জীবনে ডা. দেবী শেঠী মানুষের হৃদয়ের যতœ নিয়ে লাখ লাখ মন জয় করেছেন। তিনি ১৯৫৩ সালের ৮ মার্চ ভারতের কর্ণাটক রাজ্যের দক্ষিণ কনাডা জেলার কিন্নিগলি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি অষ্টম। ডা. শেঠী মেডিকেলে পঞ্চম গ্রেডে পড়ার সময় তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকায় বিশ্বের প্রথম হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের কথা শুনে কার্ডিয়াক সার্জন হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের প্রবল ইচ্ছার বাস্তবায়ন ঘটান ১৯৯১ সালে। মাত্র নয় দিন বয়সী শিশু রনিদর হৃৎপিণ্ড অপারেশন করেন, যা ভারতবর্ষের ইতিহাসে প্রথম সফল শিশু হৃৎপিণ্ড অস্ত্রোপচার হিসেবে পরিগণিত হয়।  ভারতে সে সময় হৃৎপিণ্ডে সাফল্যজনকভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হওয়া শিশুদের মধ্যে তার বয়সই ছিল সবচেয়ে কম। বিশেষ গুণের অধিকারী এ ডাক্তার কলকাতায় মাদার তেরেসার ব্যক্তিগত চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এর কিছুকাল পর তিনি  বেঙ্গালুরুতে চলে যান এবং মণিপাল হার্ট ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেন। এ পর্যন্ত তিনি প্রায় ১৫ হাজারের বেশি কার্ডিয়াক সার্জারি করেছেন। ১৯৮২ সালে কস্তুরবা মেডিকেল কলেজ থেকে তিনি ডাক্তারি বিদ্যায় গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। পরে ইংল্যান্ড থেকে সার্জারি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নেন। নিজের দেশের মানুষকে সেবা দিতে লন্ডন ছেড়ে ১৯৮৯ সালে ফিরে আসেন। তারপর কলকাতায় ডা. রায়ের সঙ্গে গড়ে তোলেন ভারতে প্রথম হৃদরোগ চিকিৎসা হাসপাতাল বি এম বিড়লা হার্ট রিসার্চ সেন্টার। কিন্তু ভারতীয়দের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা ইউরোপিয়ানদের তুলনায় তিনগুণ বেশি হওয়ায় এই একটি হাসপাতাল যথেষ্ট ছিল না। এ জন্য ডা. দেবী শেঠী ও ডা. রায় মিলে আরও তিনটি হৃদরোগ চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। বি এম বিড়লা হার্ট সেন্টার যাত্রা শুরুর অল্প দিনের মধ্যে ভারতের শ্রেষ্ঠ হার্ট হাসপাতালের একটিতে পরিণত হয়। ১৯৯৭ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত ডা. দেবী শেঠী ৪ হাজার শিশুর হার্ট সার্জারি সম্পন্ন করেন। তাদের অধিকাংশই দরিদ্র পরিবার থেকে আসা এবং এদের সবাইকেই তিনি বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দিয়েছেন। এ ছাড়াও ডা. দেবী শেঠী এবং তার নারায়ণা হৃদয়ালয় দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে ওপেন হার্ট সার্জারির মতো ব্যয়বহুল চিকিৎসা দেয়।

 

গুরুতর স্ট্রোকের রোগীদের চিকিৎসক মাইকেল এ ওয়েবার

বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কের ডনস্টেট কলেজ অব মেডিসিনের প্রফেসর অব মেডিসিন হিসেবে আছেন। একই সঙ্গে ক্লিনিকাল হাইপারটেনশন পত্রিকার সম্পাদক ইন চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। শুধু তাই নয়, ডা. মাইকেল এ ওয়েবার ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব হাইপারটেনশন এবং জনস্বার্থে সেন্টার ফর মেডিসিনের পরিচালনা পর্ষদের নির্বাহী কমিটিতেও কাজ করেন। তার গবেষণালব্ধ বিদ্যা গুরুতর স্ট্রোকের ঝুঁকিসম্পন্ন রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। তিনি অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সিডনি থেকে মেডিকেলে গ্র্যাজুয়েশন নিয়ে নিজের ডাক্তারি পেশা শুরু করেন। এরপর সেখান থেকেই গবেষণা ও ফেলোশিপ করে কর্নেল ইউনিভার্সিটিতে অ্যাসিসটেন্ট প্রফেসর হন। একই সঙ্গে নিউইয়র্ক হাসপাতালের অ্যাটেনডিং ফিজিশিয়ান হিসেবে কাজ করেন। এ পদে সফলতার সঙ্গে তিনি প্রায় দুই দশক পার করেন। বর্তমানে তিনি ডনস্টেট কলেজ অব মেডিসিনে অ্যাসোসিয়েট ডিন অব রিসার্চ হিসেবে কাজ করেন। বিভিন্ন জার্নালে তিনি কমপক্ষে ৫০০ লেখা প্রকাশ করেছেন। চিকিৎসা বিদ্যার ওপরে তার একাধিক বইও আছে, যা ডাক্তারদের জন্য নির্দেশনা হিসেবে কাজ করে।

 

স্পোর্টস কার্ডিওলজিতে বিশ্বের অন্যতম অভিজ্ঞ সঞ্জয় শর্মা

কার্ডিয়াক ডিজিজের বিশেষজ্ঞ প্রফেসর সঞ্জয় শর্মা। তার দক্ষতা রয়েছে কার্ডিওমাইয়োপ্যাথি, এথনিক ডিফরেন্স ইন কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজ, ইকোকার্ডিওগ্রাফি এবং হঠাৎ মৃত্যু ঘটানো রোগের ওপর। তবে তিনি স্পোর্টস কার্ডিওলজিতে বিশ্বের অন্যতম অভিজ্ঞ ব্যক্তি। বিশেষ করে যারা অ্যাথলেটে অংশগ্রহণ করেন তাদের হার্টের কন্ডিশন নিয়ে এ ডাক্তারের গভীর গবেষণা রয়েছে। প্রফেসর শর্মা লিডস ইউনিভার্সিটি থেকে ১৯৮৯ সালে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন। এরপর সেন্ট মেরি হাসপাতাল, প্যাডিংটন এবং সেন্ট জর্জ হাসপাতালের লন্ডনে কার্ডিওলজি প্রশিক্ষণ নেন। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত ইউনিভার্সিটি হসপিটাল লুইশামের একজন পরামর্শদাতা কার্ডিওলজিস্ট এবং চিকিৎসক ছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত কিংস কলেজ হাসপাতালের হার্ট মাসল ডিজিজের ডিরেক্টরের ভূমিকা পালন করে। এরপর তিনি কার্ডিওকিক রিস্ক ইন দ্য ইয়ং নামে পরামর্শদাতা কার্ডিওলোজিস্ট হয়ে ২০১০ সালে ক্রীড়া কার্ডিওলজিতে অধ্যাপক হন। এটি একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠান। তিনি ইউরোপিয়ান সোসাইটি অব কার্ডিওলজির মেম্বার। ১২০টির ওপরে লেখা প্রকাশ হয়েছে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক জার্নালে।

 

১৪টি দেশে চলে ডা. স্কটের আবিষ্কৃত বিদ্যা

ডা. স্কট সলোমন নন ইনভ্যাসিভ কার্ডিয়াক ল্যাবরেটরি পরিচালনা করেন। সরাসরি নির্দেশনা দেন কার্ডিয়াক এমআরআই প্রোগ্রামকে। দেহের অভ্যন্তরে বাম ভেন্ট্রিকুলার রিমডেলিংয়ের স্বতন্ত্র প্রক্রিয়া বুঝতে সহায়তা করে ডা. স্কট সলোমনের গবেষণা। হৃদরোগে আর একটি মানুষেরও যেন মৃত্যু না হয় সে জন্য দিনরাত খেটে যান এ মানুষটি। সহকর্মীদের নিয়ে ড. সলোমন বিভিন্ন মায়োকার্ডিয়াল রোগে বাম ভেন্ট্রিকুলার প্রাচীর চাপের পরিস্থিতি বোঝার জন্য তৈরি করেছেন বাম ভেন্ট্রিকেলের কম্পিউটারভিত্তিক থ্রি-ডি মডেল। এ জন্য সাহায্য নিয়েছেন ইকোকার্ডিয়োগ্রাফিক চিত্রের। সূক্ষ্ম উপাদান বিশ্লেষণে কাঠামোগত এ নকশা নিয়মিতভাবে ব্যবহৃত একটি প্রকৌশলী কৌশল, যা রোগযুক্ত বাম ভেন্ট্রিকেল যেমন একটি কাঠামোর আঞ্চলিক চাপ বিতরণের বিশ্লেষণের জন্য আদর্শ উপযুক্ত কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ডা. সলোমন ‘ব্রাইহ্যাম ও উইমেন্স হসপিটাল’ এ কোর ইকো ল্যাবরেটরি পরিচালনা করেন এবং এমআই-এর পরে বাম ভেন্ট্রিকুলার পুনর্র্নির্মাণের দুটি প্রধান আন্তর্জাতিক ট্রায়াল পরিচালনা করেন। বিশ্বের ১৪টি দেশে হাজারো রোগী তার আবিষ্কৃত বিদ্যায় চিকিৎসা নিচ্ছেন।

 

একাধিকবার শীর্ষ স্বীকৃতি মিলেছে ডা. ভ্যালেটিনের

ধমনী রোগ, এথেরোস্লেরোসিস এবং থ্রম্বোসিস রোগ বিষয়ে ডাক্তার ভ্যালেটিন ফস্টার ৯০০-এর বেশি নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়াও কার্ডিওলজির দুটি পাঠ্যপুস্তক ‘দ্য হার্ট’ এবং ‘এথেরোথ্রম্বোসিস অ্যান্ড করোনারি অ্যারেরি ডিজিজ’-এর প্রধান সম্পাদক ছিলেন। ফস্টার নেচার রিভিউ কার্ডিওলজির সাবেক সম্পাদক-ইন-চিফ। কার্ডিওলজিস্ট হিসেবে তিনি এতটাই দক্ষ যে, আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের ক্লিনিকাল কার্ডিওলজি কাউন্সিল থেকে ১৯৯৬ সালে প্রিন্সিপে ডি অস্টুরিয়া অ্যাওয়ার্ড অর্জন করেন। এটি বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তিতে দেওয়া সর্বোচ্চ পুরস্কার। ২০০৮ সালে ফস্টার ইউরোপীয় একাডেমি অব সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টস থেকে কার্ট পোলার কার্ডিওভাসকুলার অ্যাওয়ার্ড পেয়েছিলেন। কার্ডিওভাসকুলার ইমেজিংয়ের উন্নয়নের জন্য তার বৈজ্ঞানিক সাফল্য ছুঁয়েছে শীর্ষস্থান। এ জন্যও তিনি ২০০৯ সালে আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি ডিস্টিটিউশেড শিক্ষক পুরস্কার পেয়েছিলেন। সে বছর সম্মানিত ইন্টারন্যাশনাল অরিগো রেকর্ড পুরস্কার পান তিনি। তার কর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ঝুঁলিতে জমা পড়েছে ফ্রান্সের ইনস্টিটিউট থেকে ফিফার লেফোলন ডালান্ডে গ্র্যান্ড প্রিক্স অ্যাওয়ার্ড।